
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানী ঢাকা–র বুকে ক্যাসিনো জুয়ার অন্ধকার সাম্রাজ্যের ছায়া এবার পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তার নামেও—বাড্ডা থানার ওসির বিরুদ্ধে জুয়ার আসর থেকে নিয়মিত অবৈধ অর্থ গ্রহণের বিস্ফোরক অভিযোগ জমা পড়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়-এ। আইনগত সহায়তা প্রদান কেন্দ্র ডিপিবিএল-এর করা ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, বাড্ডা এলাকার বাড্ডা জাগরণী ক্লাব-কে ঘিরেই গড়ে উঠেছে মাসে লাখো টাকার অবৈধ লেনদেনের এক গোপন ক্যাসিনো নেটওয়ার্ক।
অভিযোগটি প্রেরণ করা হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর সিনিয়র সচিব বরাবর।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, বাড্ডা থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ কাজী নাসিরুল আমীন (বিপি-৭৮০৬০৯৮৪২৫) তার দায়িত্বাধীন এক পুলিশ কনস্টেবল বডিগার্ডের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে অবৈধ আর্থিক লেনদেন গ্রহণ করে আসছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বডিগার্ডের মাধ্যমেই অর্থ সংগ্রহ, সমন্বয় ও হস্তান্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।
অভিযোগপত্রে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়, বাড্ডা থানা এলাকার একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর চলমান রয়েছে—বাড্ডা জাগরণী ক্লাব। সেখানে নিয়মিতভাবে ক্যাসিনো ও বিভিন্ন ধরনের জুয়ার আয়োজন করা হচ্ছে।
ডিপিবিএলের অভিযোগে বলা হয়, উক্ত ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে চলমান জুয়ার আসর থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ১০ লাখ টাকারও বেশি অবৈধ অর্থ সংশ্লিষ্ট ওসি তার বডিগার্ডের মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকেন। এই অবৈধ অর্থের বিনিময়ে জুয়ার আসরগুলোতে কোনো ধরনের পুলিশি অভিযান, নিয়মিত নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহায়তা কিংবা আইনগত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে নির্বিঘ্নে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ এসব জুয়ার আসরে অংশগ্রহণ করে। জুয়া পরিচালনার পাশাপাশি সেখানে নগদ অর্থ লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্যান্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন এবং সংগঠিতভাবে হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও বিদ্যমান রয়েছে। এসব কার্যক্রম কার্যত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও সংশ্লিষ্ট থানার পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
ডিপিবিএলের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, বিষয়টি একাধিকবার মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। বরং অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযানের সম্ভাব্য তথ্য আগামভাবে জুয়ার আয়োজকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, যার ফলে প্রতিবারই সাময়িকভাবে আসর বন্ধ রেখে পরবর্তীতে আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত পরিসরে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়।
অভিযোগপত্রে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২৯৪ ধারা (প্রকাশ্যে অশালীন ও বেআইনি কার্যক্রম), ১০৯ ধারা (অপরাধে সহায়তা), দুর্নীতি দমন আইন, ২০০৪-এর প্রাসঙ্গিক বিধানসহ প্রচলিত জুয়া ও অনৈতিক কার্যক্রম সংক্রান্ত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিপিবিএলের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত থানাপ্রধানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং পুলিশের পেশাগত নিরপেক্ষতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগপত্রে কমিশনার কার্যালয়ের কাছে নিম্নোক্ত আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে—
১. অভিযোগের বিষয়ে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন।
২. তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত অফিসার ইনচার্জকে প্রশাসনিকভাবে অন্যত্র বদলি অথবা সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা।
৩. অভিযুক্ত বডিগার্ডের আর্থিক লেনদেন, মোবাইল কল রেকর্ড, ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন যাচাই।
৪. বাড্ডা জাগরণী ক্লাবের ভেতরে পরিচালিত সব ধরনের জুয়ার আসর তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট আয়োজক ও ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু।
৫. অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রযোজ্য ফৌজদারি মামলা দায়ের।
অভিযোগে আরও বলা হয়, এটি কেবল একটি থানার অভ্যন্তরীণ অনিয়মের বিষয় নয়; বরং সংঘবদ্ধ অপরাধকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়ার একটি গুরুতর দৃষ্টান্ত, যা সংবিধান ও আইনের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।
এ বিষয়ে প্রতিবেদক অভিযুক্ত অফিসার ইনচার্জ ও সংশ্লিষ্ট বডিগার্ডের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডিপিবিএল জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জনস্বার্থে বিষয়টি উচ্চ আদালতের রিট এখতিয়ারে উপস্থাপন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।









