
নিজস্ব প্রতিবেদক
সবজি বিক্রি করে কোন মতে সংসার চালান ইসমাইল হোসেন। টানাপোড়েনের সংসারে একটু ভালো থাকার আশায়। লটারিতে ভাগ্য বদলে যাওয়ার আশায় টানা ৩ দিন ১৫টি করে টিকিট কেটেও ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারেনি ইসমাইল ইসমাইল হোসেনের বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার টিকারবিলা বাজার এলাকায়। ইসমাইলের মতো অনেকে ভাগ্যের চাকা বদলানোর জন্য টিকিট কেটে নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে।
মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার দারিয়াপুর ইউনিয়ন গোয়ালদাহ খেয়া ঘাট সংলগ্ন আনন্দ মেলার নামে জমজমাট ভাবে চলছে “ওঠাও বাচ্চা” লটারির আসর। অভিযোগ, স্থানীয় সাংবাদিক, প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং কতিপয় জনপ্রতিনিধিকে ম্যানেজ করে চলছে আনন্দ। আনন্দ মেলার মুল ফটকে সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন এর ছবি লাগিয়ে নামমাত্র পুরষ্কার দিয়ে প্রতিদিন লুটপাট করা হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা।
সরেজমিনে প্রতিবেদক শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত শ্রীপুর উপজেলা সহ বিভিন্ন উপজেলার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে আনন্দ মেলার নামে চটকদারি পুরষ্কারের ঘোষণা দিয়ে চলছে লটারির মাইকিং। লটারির প্রতিদিনের টিকিট মূল্য ২০ টাকা। যদিও প্রচার ইজিবাইকের পিছনে লেখা আছে প্রবেশের টিকিটের উপর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
আকর্ষণ হিসেবে ৫০ টির মতো পুরষ্কারের মধ্যে প্রথম পুরষ্কার মটর সাইকেল, বিভিন্ন পুরষ্কার হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। দারিয়াপারা আনন্দ মেলা উদ্বোধন করেন মাগুরা ১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন তার পর থেকে লটারির নামক জুয়ার টিকিটের বিক্রি শুরু হয় ।
টিকিট ফেলার জন্য ১৫৬টি বক্স ও প্রচারণার জন্য ৮৮টি ইজিবাইকের এর ব্যবস্থা করেছেন ‘ওঠাও বাচ্চা’ লটারির পরিচালক আজাদ মিয়া।
শ্রীপুর উপজেলার মধ্যে প্রচারণার জন্য একজন ইজিবাইক চালককে দেয়া হচ্ছে এক হাজার টাকা। উপজেলার বাইরে গেলে দেড় হাজার। এক একজন প্রচারকারি পাচ্ছেন ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা। যারা বিভিন্ন স্থানে বসে টিকিট বিক্রি করছেন তারা প্রতিদিন পাচ্ছেন পাঁশত থেকে সাতশত টাকা। রাত ১০টার পরপরই লটারি শুরুতেই দর্শণার্থী এক বাচ্চাকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তার চোখে কালো কাপড় বেঁধে চারকোনায় চারজনকে দাঁড় করিয়ে কাপড় টানিয়ে ঢালা হয় বিক্রিত টিকিটের মুড়ি বা ছোট অংশ। এরপর ওই বাচ্চা একএক করে নির্ধারিত পুরষ্কারের আলোকে সেই কয়টি লটারির টিকিটের মুড়ি অংশ তুলে ধরে সকলের সামনে। পরে ওই লটারির নাম্বার ঘোষণা দেয়া হয়।
গত এক সপ্তাহের পুরষ্কারের হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার পুরষ্কার দেয়া হয়। অথচ প্রতিদিন ২২ থেকে ২৫ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হয়। সেক্ষেত্রে এক মাস সাত দিন মেলা চললে পরবর্তী এক মাসের বিক্রিত টিকিট মূল্য থেকে পুরষ্কার মূল্য, ইজিবাইক, প্রচারকারি, ডেকরেটরসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে মোট ৬০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে ধারণা করছে স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, লটারি টিকিট কেটে পুরষ্কারের নামে বাড়ছে চুরি ও ছিনতাই। বাড়ি থেকে জিনিসপত্র ও টাকা চুরি করে লটারি টিকিট কিনতে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের টাকা দিয়ে প্রতিদিন মোটা অংকের লটারির টিকিট কিনতে যেয়ে অনেকেই হচ্ছেন সর্বশান্ত। আবার ঘটছে পারিবারিক অশান্তি।
অবিলম্বে এ লটারি বন্ধের দাবি জানান শ্রীপুর উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা।
দারিয়াপুরের রুবেল হোসেন। পেশায় বাসের হেলপার। প্রতিদিন যে আয় হয় তাতে ১০টির বেশি টিকিট কেনা যায় না। বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেশি টিকিট কিনেছেন। এখন আর কেউ টাকা না দেয়ায় বাড়ির লোহার শাবল চুরি করে শুক্রবার রাতে ৯০ টাকায় বিক্রি করে অতিরিক্ত চারটি টিকিট কিনেও পুরষ্কারের ভাগ্য খোলেনি রুবেলের।
চিলগাড়ী বাজার এলাকার ইমান আলীর ছেলে নজরুল ইসলাম নজু পুরষ্কারের লোভে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি টিকিট কিনেছেন। বিক্রি করেছেন একটি গাভী গত ৫ দিনে লটারির পিছনে খরচ করেছেন ৩০ হাজার টাকা। প্রতিবাদ করায় শনিবার সকালে স্ত্রীকে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
একইভাবে শ্রীপুর উপজেলা সদরে হোটেলের মালিক শাহজাহান প্রতিদিন বড় অংকের টিকিট কেটেছেন হোটেলে বিক্রি কৃত অর্থ দিয়ে এখন সংসারে চলছে প্রতিনিয়ত অশান্তি।
অন্যদিকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মোড়ের চায়ের দোকানদার আবুল কালাম স্ত্রী ও ছেলেকে দোকানে বসিয়ে ছুটেছেন লটারিতে মোটর সাইকেল পাওয়ার আশায়। প্রতিদিন কিনেছেন ৭০ থেকে ১০০টি টিকিট। এভাবেই ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য প্রলোভনে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে আসছে শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দারা
বিষয়টি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অনুমোদনহীন লটারি বা এ ধরনের ভাগ্যনির্ভর অর্থ লেনদেন কার্যক্রম সরাসরি জুয়া আইন লঙ্ঘন এছাড়াও বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে লটারি নামক জুয়ার টিকিট বিক্রি করা প্রতারণা উপজেলার মধ্যে এতো পরিমাণ মাইক বাজানো শব্দ দূষণ ক্যাবল অপারেটর এর মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করা সহ একাধিক দণ্ডনীয় অপরাধ করে আসছে চক্রটি। এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সাধারণ জনগণের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা নিয়ে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ ?
এ বাপারে মাগুরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে শনিবার বিভিন্ন সময়ে মোবাইলে যেগোযোগ করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।










